টাঙ্গাইল প্রতনিধি-: আশি^নের শুরুতেই টাঙ্গাইলের দিগন্তজোড়া মাঠে মাঠে শোভা পাচ্ছে আগাম শীতকালীন সবজির সবুজ সমারোহ। শীত আসতে এখনো বেশ কিছুদিন বাকি থাকলেও, আগাম সবজি চাষে এখন তুমুল ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার কৃষকেরা। বিশেষ করে সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত পাহাড়ি অঞ্চল মধুপুর, ঘাটাইল, ধনবাড়ি, সখীপুর এবং যমুনা-ধলেশ^রীর অববাহিকার চরাঞ্চলের কৃষিজমিগুলো এখন হরেক রকম সবজিতে ভরে উঠেছে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আগাম সবজির বাম্পার ফলন এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় বুক বাঁধছেন স্থানীয় চাষিরা। সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সারি সারি শাকসবজির আবাদ। বেশিরভাগ কৃষিজমিতে মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, লাউ, টমেটো, লালশাক ও পুঁইশাকসহ হরেক রকম শীতকালীন সবজির চাষ শুরু হয়েছে। কোথাও কোথাও ইতিমধ্যে আগাম জাতের লালশাক, মুলা ও লাউ বাজারে উঠতে শুরু করেছে। মৌসুমের শুরুতে বাজারে এসব নতুন সবজির চড়া চাহিদা থাকায় বেশ ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকেরা। অধিক ফলন ও কাক্সিক্ষত লাভের আশায় কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করছেন এতদঞ্চলের কৃষক-কৃষাণীরা। কেউ নতুন চারা রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করছেন, কেউ চারাগাছের গোড়ায় মাটি দিচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত নিড়ানি ও রোগবালাই দমনে বালাইনাশক স্প্রে করায়। শুধু পুরুষেরাই নন, সবজি পরিচর্যা ও চারা উৎপাদনে সমান তালে ভূমিকা রাখছেন গ্রামীণ নারীরাও। সরেজমিনে স্থানীয় চাষিরা জানান, সাধারণ সময়ের চেয়ে আগাম সবজি বাজারে তুলতে পারলে দ্বিগুণ বা তিনগুণ পর্যন্ত বেশি লাভ করা যায়। এই লাভজনক দিক বিবেচনা করে গত কয়েক বছর ধরে টাঙ্গাইলে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে আগাম সবজি চাষের ধুম পড়েছে। চরাঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলের উর্বর মাটি আগাম সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় প্রতিবছরই এখানে আবাদের পরিধি বাড়ছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই অঞ্চলের সবজি প্রতিদিন ট্রাকবোঝাই হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে সরবরাহ করা হচ্ছে। মধুপুর উপজেলার দরিহাসিল গ্রামের আব্বাস আলীর ছেলে কৃষক রায়হান কাজী ফুলকপিক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। ইতিমধ্যে সবুজে সবুজে ভরে উঠতে শুরু করেছে তাঁর ফসলি জমি। সারি সারি ক্যাপটেন ও উইনার জাতের ফুলকপি শোভা পাচ্ছে তাঁর ৭০ শতাংশ জমিতে। রোগবালাই দমন করতে বাঁধাকপিক্ষেত পরিদর্শন করে পরামর্শ দিচ্ছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম। কৃষক রায়হান কাজী জানান, তিনি ১৫-২০ দিন আগে ৭০ শতাংশ জমিতে ১৬ হাজার ক্যাপটেন ও উইনার জাতের ফুলকপির চারা রোপণ করেছেন। এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১ লাখ টাকার কিছু বেশি। মাস দুই পর কপি বিক্রি করতে পারবেন। ভালো ফলন ও ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারলে খরচ বাদে ২-৩ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী ইউনিয়নের ফুলমালীর চালা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি ১ মাস আগে ৪০ শতাংশ জমিতে শিম ও লাউ চাষ করেছেন। গাছগুলো অনেক ভালো হয়েছে ও কিছু কিছু গাছে ফল আসা শুরু হয়েছে। তিনি আশা করেন এ বছর ভালো ফলন হবে। ন্যায্য দামে বিক্রি করতে পারলে তিনি লাভবান হতে পারবেন। টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা দুলাল হোসেন জানান, কৃষকদের আগাম সবজি চাষে উৎসাহিত করতে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং মানসম্মত বীজ ব্যবহারের কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবারও জেলায় রেকর্ড পরিমাণ জমিতে শীতকালীন সবজির আবাদ হবে। প্রাকৃতিক কোনো বিপর্যয় না ঘটলে কৃষকেরা তাঁদের কঠোর পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন অর্থাৎ ন্যায্যমূল্য পাবেন বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন। টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সোয়েব মাহমুদ জানান, এ বছর টাঙ্গাইল জেলায় শীতকালীন সবজি চাষে ১১ হাজার ৪৫০ হেক্টর কৃষিজমি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৪ হাজার ২২০ মেট্রিক টন। কিছু কিছু এলাকায় অধিক লাভের আশায় কৃষকেরা আগাম শীতকালীন সবজি চাষ শুরু করেছেন। তবে আগামী অক্টোবর মাস থেকে শীতকালীন সবজি চাষে পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে পড়বেন কৃষকেরা। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে সবজি চাষে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে এবং কৃষকেরাও লাভবান হবেন।
