Logo
Logo
×

ইসলাম ও জীবন

স্ত্রীদের সঙ্গে কেমন ছিল মহানবীর (সা.) আচরণ?

asif

asif

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম

স্ত্রীদের সঙ্গে কেমন ছিল মহানবীর (সা.) আচরণ?

রাসুল (সা.) ছিলেন আল্লাহর নবী। পুরো মানব জাতির হেদায়েতের দায়িত্ব ছিল তার ওপর। মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে আল্লাহর একত্ববাদের বাণী প্রচার করতেন। নবুয়তের দায়িত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্র, যুদ্ধ পরিচালনা, যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত, বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে দূত পাঠানোর মতো মহান ও গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব পালন করতে হতো তাকে। এমন মহান দায়িত্ব ও ব্যস্ততার মধ্যেও রাসুল (সা.) পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতেন এবং তাদের কথা শুনতেন। স্ত্রীদের খোঁজখবর নিতে এবং তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতেন। এক রাতে আয়েশা (রা.) তাকে উম্মে যার-এর দীর্ঘ কাহিনি শোনান। সেখানে তিনি বলেন, ১১ জন নারী একত্র হয়ে নিজেদের স্বামীদের দাম্পত্য জীবনের সব গোপন বিষয় একে অপরের কাছে প্রকাশ করার অঙ্গীকার করেছিলেন এবং কিছুই গোপন রাখবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রত্যেক নারী তার স্বামীর বর্ণনা দেন। তাদের মধ্যে উম্মে যার তার স্বামীর যে বর্ণনা দেন এতে বুঝা যায় তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামীদরে একজন। যিনি স্ত্রীর সুযোগ, সুবিধা ও যতেœর প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখেন। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বললেন, উম্মে যারের কাছে আবু যার যেমন, তোমার কাছে আমিও তেমন। (সহিহ মুসলিম)

একজন স্বামীর উচিত স্ত্রীর সঙ্গে বসে তার কথা শোনা, তার সঙ্গে সময় কাটানো এবং তার সঙ্গে আন্তরিকভাবে মেলামেশা করা। বর্তমানে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা স্বামীকে স্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার সুযোগ করে দিয়েছে। স্ত্রী কেমন আছেন, তা জানতে তিনি একটি খুদে বার্তা পাঠাতে পারেন কিংবা ফোন করতে পারেন। এতে এক মিনিটের বেশি সময় লাগবে না, কিন্তু স্ত্রীর কাছে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।

স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে দ্বিধা করতেন না
অনেক স্বামী-স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ না করেই বছরের পর বছর কাটিয়ে দেন। কেউ কেউ আবার ভালোবাসা প্রকাশ করাকে অনুপযুক্ত কিংবা পুরুষত্বের পরিপন্থী মনে করেন। অথচ স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ দাম্পত্য সম্পর্ককে সুন্দর ও দৃঢ় করার এবং সুখী দাম্পত্য জীবন বজায় রাখার অন্যতম শক্তিশালী উপায়। সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.) রাসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, মানুষের মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে? তিনি বললেন, আয়েশা। আমর (রা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তার বাবা। (সহিহ বুখারি)

আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, আমি ঋতু¯্রাবের সময় পানি পান করতাম। এরপর পাত্রটি রাসুলুল্লাহর (সা.) হাতে দিতাম। আমার মুখ যেখানে ছিল, তিনি সেখানেই মুখ রেখে পানি পান করতেন। আবার আমি ঋতু¯্রাবের সময় হাড় থেকে গোশত খেয়ে তা তাকে দিতাম। আমার মুখ যেখানে ছিল, তিনিও সেখানেই মুখ রেখে তা খেতেন। (সহিহ মুসলিম)

এই বর্ণনা তার কোমল আচরণ, বিবেচনাবোধ ও মহৎ চরিত্রের প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে, স্ত্রীর ঋতু¯্রাব চলাকালে তার স্পর্শ, পাশে বসা, তার সঙ্গে খাওয়া বা তার কাছ থেকে দূরে থাকা উচিত নয়।

স্ত্রীদের অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন
কোনো স্ত্রী সন্তুষ্ট নাকি অসন্তুষ্ট তা বুঝতে পারতেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। একবার তিনি আয়েশা (রা.)-কে বললেন, তুমি কখন আমার ওপর সন্তুষ্ট ও কখন অসন্তুষ্ট হও, তা আমি ভালোভাবেই বুঝতে পারি। আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে বুঝতে পারেন? তিনি বললেন, তুমি যখন আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকো, তখন শপথ করে বলো, মুহাম্মদের রবের কসম। আর যখন আমার ওপর অসন্তুষ্ট থাকো, তখন বলো, ইবরাহিমের রবের কসম। আয়েশা (রা.) বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে আল্লাহর কসম, আমি শুধু আপনার নামটিই বাদ দিই। (সহিহ বুখারি)

অসুস্থ স্ত্রীকে সান্ত¡না 
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, কোনো স্ত্রী অসুস্থ হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তার কাছে যেতেন, ডান হাত দিয়ে অসুস্থ স্থানে হাত রাখতেন এবং সুস্থতার জন্য করতেন।তিনি বলতেন, হে আল্লাহ, মানুষের প্রতিপালক! এই রোগ দূর করে দিন এবং তাকে সুস্থ করে দিন। আপনিই মহান আরোগ্যদাতা। আপনার আরোগ্যদান ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দান করুন, যার পর কোনো রোগ অবশিষ্ট থাকবে না। (সহিহ বুখারি)

স্ত্রীদের সুরক্ষা 
সাহাবি নুমান ইবন বশির (রা.) বর্ণনা করেন, আবু বকর (রা.) একবার রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তখন তিনি তার মেয়ে আয়েশার কণ্ঠস্বর রাসুলুল্লাহর (সা.) কণ্ঠস্বরের চেয়ে উঁচু শুনতে পেলেন। তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলো।

তিনি আয়েশা (রা.)-কে টেনে ধরে বললেন, তুমি কীভাবে রাসুলুল্লাহর (সা.) কণ্ঠস্বরের ওপর তোমার কণ্ঠস্বর উঁচু করো?

এ সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আয়েশা (রা.)-কে সুরক্ষা দিলেন। আবু বকর (রা.) চলে যাওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) আয়েশা (রা.)-কে সান্ত¡না দিতে ও আনন্দিত করতে বললেন, তুমি কি দেখনি, আমি কীভাবে তোমাকে রক্ষা করেছি এবং তোমার ও তার মাঝখানে দাঁড়িয়েছি?

পরে আবু বকর (রা.) আবার এলেন। এসে দেখলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে হাসি-আনন্দ করছেন। তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলো। তখন আবু বকর (রা.) রাসুলুল্লাহকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার শান্তির সময়েও আমাকে অংশীদার করুন, যেমন আপনার বিরোধের সময়েও আমি আপনার সঙ্গে ছিলাম। অর্থাৎ, আনন্দের সময়েও আমাকে আপনার সঙ্গে রাখুন, যেমন সমস্যার সময় আপনার সঙ্গে ছিলাম। (মুসনাদে আহমদ)

স্ত্রীদের ঘরের কাজে সহযোগিতা 
আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ বর্ণনা করেন, আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরের ভেতরে কী করতেন? তিনি বললেন, তিনি তার স্ত্রীকে ঘরের কাজে সহযোগিতা করে নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। নামাজের সময় হলে তিনি নামাজের জন্য উঠে যেতেন। (সহিহ বুখারি)

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি যতœ
স্ত্রীরা যেন মুখ থেকে দুর্গন্ধ না পায় তাই ঘরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মিসওয়াক দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। তাবেঈ শুরাইহ ইবনে হানি বর্ণনা করেন, তিনি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরে প্রবেশ করার পর প্রথমে কী করতেন? তিনি বললেন, মিসওয়াক দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতেন। (সহিহ মুসলিম)

ইমাম সুয়ূতি বলেন, এর কারণ হলো, সারা দিন মানুষের সঙ্গে কথা বলার পর তার মুখের গন্ধ হয়তো পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। তাই স্ত্রীদের সঙ্গে আরও সুন্দর ও কোমল আচরণের অংশ হিসেবে তিনি মুখের দুর্গন্ধ দূর করার বিষয়ে যতœশীল ছিলেন। একজন স্বামীর উচিত স্ত্রীর জন্য নিজেকে পরিপাটি রাখা এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। ইবন আব্বাস (রা.) বলেছেন, আমি আমার স্ত্রীর জন্য নিজেকে সাজাতে পছন্দ করি, যেমন আমি পছন্দ করি সে আমার জন্য নিজেকে সাজিয়ে রাখুক। কারণ আল্লাহ বলেন, তাদের জন্যও ন্যায়সংগতভাবে তেমন অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীদের সঙ্গে হাসি-রসিকতা করতেন। তবে একই সঙ্গে তিনি তাদের দ্বীনের বিষয়ে শিক্ষা দিতে এবং তাদের আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলতেও গুরুত্ব দিতেন। সাহাবি ইবন ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। শাসক তার প্রজাদের দায়িত্বশীল এবং তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল এবং তার পরিবার সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। রাসুল (সা.) স্ত্রীদের ইবাদতে যতœশীল হতে উৎসাহ দিতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেছিলেন, হে আয়েশা, সব সময় আল্লাহকে ভয় করো এবং কোমলতা অবলম্বন করো। কারণ কোনো কিছুর সঙ্গে কোমলতা যুক্ত হলে তা তাকে সৌন্দর্যম-িত করে। আর কোনো কিছু থেকে কোমলতা দূর করা হলে তা ত্রুটিপূর্ণ ও বিকৃত হয়ে যায়। (মুসনাদে আহমদ)।

আরেক হাদিসে আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে আয়েশা, ছোট ছোট গুনাহ থেকেও সাবধান থেকো। কারণ আল্লাহ এসব গুনাহ লিখে রাখার জন্য একজন ফেরেশতা নিয়োজিত করেছেন। (সুনানে ইবন মাজাহ)

অন্য এক বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে আয়েশা, সব সময় কোমলতা অবলম্বন করো। কারণ আল্লাহ যখন কোনো পরিবারের কল্যাণ চান, তখন তিনি তাদের কোমলতার পথে পরিচালিত করেন। (মুসনাদে আহমদ)
 

সম্পর্কিত খবর

আল কোরআন ও আল হাদিস

আল কোরআন ও আল হাদিস

আল কোরআন ও  আল হাদিস

আল কোরআন ও আল হাদিস

আল-কোরআন ও আল-হাদিসের বাণী

আল-কোরআন ও আল-হাদিসের বাণী

আল কোরআন ও  আল হাদিস

আল কোরআন ও আল হাদিস

আল কোরআন ও আল হাদিস

আল কোরআন ও আল হাদিস

গালি দিলে কী অজু ভেঙে যায়

গালি দিলে কী অজু ভেঙে যায়

Logo

সম্পাদক : এস.এম জাহিদ আনোয়ার শামীম