প্রবাসী কর্মীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স শুধু লাখো পরিবারের জীবিকার ভিত্তি নয়, জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তিও। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশগামী অনেক মানুষ দেশ ছাড়ার আগেই প্রতারক চক্রের শিকার হন, আর বিদেশে পৌঁছানোর পর অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। সাম্প্রতিক সময়ে ইতালিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রতারণা, জিম্মি করা এবং শ্রমদাস হিসেবে বিক্রির চেষ্টার অভিযোগ সেই ভয়াবহ বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। দেশে কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক তরুণকে বিদেশমুখী করছে। পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করে, জমিজমা বন্ধক রেখে কিংবা ঋণ নিয়ে তারা বিদেশযাত্রার ব্যবস্থা করে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের লক্ষ্য থাকে পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা। কিন্তু এই আকাক্সক্ষাকেই পুঁজি করে সক্রিয় রয়েছে অসাধু দালাল ও মানবপাচারকারী চক্র। তারা বৈধ চাকরি, আকর্ষণীয় বেতন এবং স্থায়ী বসবাসের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। পরে দেখা যায়, প্রতিশ্রুত কোনো সুবিধাই নেই; বরং ভুক্তভোগীরা হয়ে পড়েন জিম্মি ও নিঃস্ব। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতির। মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধের মামলাগুলো দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের আশা হারায়। এর ফলে সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা যায় যে, মানুষের জীবন নিয়ে প্রতারণা করেও পার পাওয়া সম্ভব। এই সমস্যা কেবল কয়েকজন দালালের কারণে নয়; বরং এটি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের ফল। স্থানীয় দালাল, ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি, বিদেশে অবস্থানকারী চক্র এবং কখনো কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তি এর সঙ্গে জড়িত থাকে। তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন গোটা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা। আমরা মনে করি, বিদেশগামী কর্মীদের সুরক্ষায় সরকারকে আরও সক্রিয় ও কঠোর হতে হবে। অবৈধ দালাল ও প্রতারক নিয়োগ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তালিকা সহজলভ্য করতে হবে এবং ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে বিদেশে চাকরি বিষয়ে পরামর্শকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করতে হবে। মানবপাচার ও ভুয়া নিয়োগ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম শর্ত।
