Logo
Logo
×

সম্পাদকীয়

২২ ব্যাংক লোকসানে: সংকটের দায় নেবে কে?

asif

asif

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

২২ ব্যাংক লোকসানে: সংকটের দায় নেবে কে?

দেশের ব্যাংকিং খাতের যে চিত্র সংসদীয় কমিটির সামনে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের। ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি পুঞ্জীভূত লোকসানে চলছে। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত এসব ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংক খাতে পরিচালন মুনাফা হয়েছে মাত্র ৭৮৯ কোটি টাকা, অথচ নিট ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। এটি কয়েকটি ব্যাংকের বিচ্ছিন্ন দুর্বলতা নয়, বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভঙ্গুরতার বড় সংকেত।
লোকসানে থাকা ২২টি ব্যাংকের মধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক, একটি বিদেশি ব্যাংক এবং ১৫টি বেসরকারি ব্যাংক। অর্থাৎ সংকট সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই বিস্তৃত। আরও উদ্বেগজনক হলো, গত ৩০ জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ। একটি দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হয়ে পড়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক উচ্চ শ্রেণিকৃত ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল সম্পদমানকে ব্যাংকগুলোর আয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব সমস্যা তৈরি হলো কেন? অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঋণের নামে অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ যেখানে রয়েছে, সেখানে শুধু লোকসানের হিসাব প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ অনুমোদন ও তদারকির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি।
সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংক প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা নিয়েছে। সাময়িক সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের ক্ষতি বারবার জনস্বার্থের অর্থ দিয়ে পূরণ করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ব্যাংক বাঁচানোর নামে যেন অনিয়মকারীদের দায়মুক্তি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এখন প্রয়োজন ব্যাংক খাতে কঠোর ও সময়বদ্ধ সংস্কার। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা করে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করতে হবে। অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা অন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমাতে প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকট এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব বন্ধ করতে হবে। পরিচালক বা চেয়ারম্যান হওয়ার যোগ্যতা হতে হবে সততা, দক্ষতা ও আর্থিক জ্ঞান, প্রভাব-প্রতিপত্তি নয়।
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এখনই সময়বদ্ধ সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করা উচিত। কারা দায়ী, কত অর্থ অনিয়মে বেরিয়ে গেছে, কতটা আদায়যোগ্য এবং কোন ব্যাংক কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, এসবের স্পষ্ট হিসাব জনগণের সামনে আনতে হবে। জনগণের অর্থ দিয়ে ব্যাংক টিকিয়ে রাখার আগে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এখন আর শুধু তারল্য সহায়তা নয়, দরকার দায় নির্ধারণ, খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কঠোর সুশাসন প্রতিষ্ঠা।
 

সম্পর্কিত খবর

এলপিজি সংকট বাজারে কার স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে?

এলপিজি সংকট বাজারে কার স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে?

কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য আগামীর জন্য অশনিসংকেত

কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য আগামীর জন্য অশনিসংকেত

পরিবার পরিকল্পনায় স্থবিরতা সেবাব্যবস্থা দ্রুত পুনর্গঠন জরুরি

পরিবার পরিকল্পনায় স্থবিরতা সেবাব্যবস্থা দ্রুত পুনর্গঠন জরুরি

নদী-খাল রক্ষা সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি

নদী-খাল রক্ষা সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি

কমছে কৃষিজমির পরিমাণ খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে কঠোর হতে হবে

কমছে কৃষিজমির পরিমাণ খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে কঠোর হতে হবে

ভয়াবহ হচ্ছে ডেঙ্গু  স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা জরুরি

ভয়াবহ হচ্ছে ডেঙ্গু স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা জরুরি

Logo

সম্পাদক : এস.এম জাহিদ আনোয়ার শামীম