মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের বিকল্প নেই
দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। রাজনৈতিক সহিংসতা, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা, সীমান্তে প্রাণহানি এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা-সব মিলিয়ে আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যেকোনো প্রতিবেদনই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য আত্মসমালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় বহু মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা অভ্যন্তরীণ বিরোধ যাই থাকুক না কেন, সহিংসতা কখনোই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। মতবিরোধের সমাধান হতে হবে সংলাপ, আইন ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। একইভাবে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর অভিযোগও দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের স্বার্থেই এ ধরনের ঘটনার কার্যকর ও টেকসই সমাধান কূটনৈতিক পর্যায়ে আরও জোরালোভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হামলা, হুমকি বা মামলার মুখোমুখি হওয়া শুধু ব্যক্তি নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও জবাবদিহির পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। একইভাবে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, যৌতুক-সংক্রান্ত নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান সামাজিক নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবার দাবি জানায়। এসব অপরাধ প্রতিরোধে দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে গণপিটুনির ঘটনায় প্রাণহানির বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা সৃষ্টি হলে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন তাই রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। মানবাধিকার সুরক্ষা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ-সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সংবিধান ও আইনের আলোকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি অধিক নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
