ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ‘বর্জ্যের বিনিময়ে ভাসমান বাজার’ চালু
asif
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম
ঢাকা প্রতিনিধি - বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার পাশাপাশি জনগণকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতন করতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে শুরু হয়েছে ব্যতিক্রমী কার্যক্রম ‘বর্জ্যের বিনিময়ে ভাসমান বাজার’। গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর সোয়ারীঘাট লঞ্চ ঘাটে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। এ সময় তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীর ওপরই প্রাচীন ঢাকা গড়ে উঠেছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের মূল ভিত্তি ছিল এই নদী। কিন্তু অবৈধ দখল ও যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার কারণে বুড়িগঙ্গার অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। এই নদীকে বাঁচাতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আজ হয়তো একদিনে বুড়িগঙ্গার সব সমস্যার সমাধান হবে না, তবে এই কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা নদী তীরের বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের কাছে এই সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। ডিএসসিসি প্রশাসক আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ঢাকার চারপাশের নদীগুলোÑবুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীকে নৌ-চলাচলের উপযোগী করার জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে ইতোমধ্যেই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। তিনি জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে টানা তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ৭৫টি ওয়ার্ডেই প্রতিদিন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালুর পাশাপাশি প্রতি গতকাল শনিবার বিশেষ অভিযান পরিচালিত হবে। কর্তব্যে অবহেলা করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও কোথাও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত থাকবে। আবদুস সালাম বলেন, বর্জ্যকে শুধু আবর্জনা হিসেবে না দেখে সম্পদে রূপান্তর করতে হবে। বর্জ্য রিসাইক্লিং করে কীভাবে আমরা দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি, সেটার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, কয়েক মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে প্রাথমিক ধাপে যেতে পারবো। তিনি বলেন, তখন বর্জ্য একটি সম্পদে রূপান্তরিত হবে। তখন আর বর্জ্য যেখানে-সেখানে পড়ে থাকবে না। একদিকে জনগণকে সচেতন করতে হবে, অন্যদিকে বর্জ্য রিসাইক্লিং করে বিদ্যুৎ, গ্যাস, কম্পোস্ট সার ও ডিজেল উৎপাদন করতে হবে। এ বিষয়ে আমাদের কার্যক্রম প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, বুড়িগঙ্গা একসময় ঢাকার প্রাণ ছিল। কিন্তু বর্তমানে নদীতে প্লাস্টিক, পলিথিনসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ভাসছে। নদী ও পরিবেশ দূষণ রোধে নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের বার্তা দিতেই বর্জ্যের বিনিময়ে ভাসমান বাজার’ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা জানি, আজকের এই কার্যক্রমের মাধ্যমে বুড়িগঙ্গার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। কিন্তু জনগণের কাছে একটি বার্তা যাবেÑআমরা এটা করতে চাই এবং এটা আমাদের করা দরকার। বুড়িগঙ্গাকে রক্ষায় নাগরিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নদীর দুই পাড়ে যারা বসবাস করেন এবং যারা নদীকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, তাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বুড়িগঙ্গা যে পর্যায়ে এসেছে, এটিকে রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীকে নৌ চলাচলের উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ঢাকার নদীগুলোকে ঘিরে আগের নৌ যোগাযোগব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আবদুস সালাম জানান, ‘বর্জ্যের বিনিময়ে ভাসমান বাজার’ কার্যক্রমের আওতায় নদী ও নদীর তীর থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করা হবে। এ কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কামরাঙ্গীরচরে একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে বর্জ্য রিসাইক্লিং করে কীভাবে তা সম্পদে রূপান্তর করা যায়, সে বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করা হবে। বিরোধী দলের লংমার্চ বা রোডমার্চের মতো কর্মসূচি না করে সরকারকে সময় দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আব্দুস সালাম বলেন, বিরোধী দলকে বলবো লংমার্চ না করে, রোডমার্চ না করে সরকারকে একটু সময় দেন। আপনারাও ধৈর্য ধরেন, দেশটা যাতে ভালো দিকে এগিয়ে নেওয়া যায়। পাঁচ বছরের জন্য জনগণ রায় দিয়েছে, অপেক্ষা করেন। ছয় মাসও অতিক্রান্ত হয়নি, এখনই বলেন ‘পাই নাই, পাই নাই’ এভাবে তো হবে না। তিনি বলেন, তারেক রহমানের কাছে যাদুর চেরাগ নেই যে তিনি ঘষা দিলেই ছয় মাসে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। দুর্ভোগ না বাড়িয়ে, পুরাতন স্বৈরাচারকে ফিরে আসার পথ তৈরি না করে জনগণের পাশে থাকেন। বিরোধী দলকে বর্জ্য পরিস্কারে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা যদি দুই-চার জায়গায় আবর্জনা পরিস্কারে আমাদের সহযোগিতা করতেন, তাহলে আমরা খুশি হতাম। আসেন, আমাদের সঙ্গে বর্জ্য পরিস্কার করেন। আমরা এই বুড়িগঙ্গাটাকে পরিস্কার করার চেষ্টা করি। আর যদি সেটা না করেন, অন্তত ডিস্টার্ব না করে সরকারকে সহযোগিতা করেন। এ সময় বুড়িগঙ্গা পরিস্কারের পাশাপাশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগের কথাও জানান ডিএসসিসি প্রশাসক। তিনি বলেন, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে রিসাইক্লিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, কম্পোস্ট সার ও ডিজেল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা-৭ আসনের এমপি হামিদুর রহমান বলেন, নদী ও নদীর পাড়ে পড়ে থাকা প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্য সংগ্রহে মানুষকে উৎসাহিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। বর্জ্যের বিনিময়ে খাদ্য ও নিত্যপণ্য দেওয়ার মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনার ধারণা তৈরি হবে। তিনি বলেন, নদীপাড়ের দরিদ্র মানুষদের সম্পৃক্ত করে এ কার্যক্রম নিয়মিত চালু রাখা প্রয়োজন। এ জন্য একটি নির্দিষ্ট বর্জ্য সংগ্রহের স্থান ও অফিস স্থাপন করা হলে বর্জ্য সংগ্রহের পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও নিত্যপণ্যের চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বুড়িগঙ্গার তীরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বর্জ্য সংগ্রহ করে ডিএসসিসির অস্থায়ী ভাসমান বাজারে জমা দেওয়ার বিনিময়ে উপহার হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়া হয়। একটি লঞ্চকে সাজিয়ে এই সাময়িক ভাসমান বাজার তৈরি করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য জনাব হামিদুর রহমান। এ ছাড়া ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় বিশিষ্টজনরা উপস্তি ছিলেন।
