রাজধানীর অলিগলিতে প্রকাশ্যেই মাদকের কেনাবেচা চলছে। প্রতিদিন বিশেষ অভিযানে শত শত অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছে, হাজারো মানুষ আটক হচ্ছে, তবুও মাদক নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসছে না। শহরের হটস্পটগুলোতে মানুষ লাইন ধরে ইয়াবা, হেরোইনসহ নানা ধরনের মাদক কিনছেÑএ দৃশ্য শুধু ভয়াবহই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। দেশে কয়েক কোটি মানুষ অবৈধ মাদক সেবন করে বলে ধারণা করা হয়। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। রাজধানীর মতো শহরে নতুন ধরনের মাদক যুক্ত হয়েছে, এমনকি মাদক তৈরির কারখানারও সন্ধান মিলেছে। দেশি-বিদেশি চক্র মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে, আর এতে ধ্বংস হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের একাংশ। মাদকের অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেকেই চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, পরিবারগুলো ভেঙে পড়ছে। সমাজে অপরাধের হার বাড়ছে, আর সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। মাদক শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকে ধ্বংস করে। তরুণরা যখন মাদকের ফাঁদে পড়ে, তখন তাদের কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়, শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, আর পরিবারগুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠছে। অনেক সময় দেখা যায়, মাদকাসক্তরা চিকিৎসা নিতে চাইলেও পর্যাপ্ত সুযোগ পান না। ফলে তারা আবারও মাদকের দিকে ফিরে যায়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে মাদক নিয়ন্ত্রণে শূন্য সহনশীলতা অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলা করলে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না। সরকারের পক্ষ থেকেও বারবার কঠোর অবস্থানের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অভিযান চালানো হলেও মাদক ব্যবসার শিকড় অটুট থেকে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শীর্ষ কারবারিদের গ্রেপ্তার, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ। মাদকবিরোধী লড়াইকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে নতুন মাদক প্রবেশ করতে না পারে। মাদকাসক্তদের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সমাজে ফিরে আসতে পারে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের জন্য বিকল্প বিনোদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা মাদকের দিকে না ঝুঁকে। মাদক শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি জাতীয় সংকট। তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এখনই কঠোর, নিরপেক্ষ এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় মাদক আমাদের ভবিষ্যৎকে গ্রাস করবে।
