একটি শহরের বাসযোগ্যতা শুধু ভবন, সড়ক ও উড়ালসেতুর সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না; তার প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ কতটা সচল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার চারপাশের নদী এবং শহরের ভেতরের খালগুলো বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও নৌযোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা। অথচ অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দূষণ ও দখলের কারণে এই প্রাকৃতিক অবকাঠামো ক্রমেই কার্যকারিতা হারাচ্ছে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা, শুষ্ক মৌসুমে দুর্গন্ধযুক্ত পানি এবং নদীতীরে অবৈধ স্থাপনার বিস্তার সেই ব্যর্থতার দৃশ্যমান ফল। ঢাকার নদী ও খাল ঘিরে বর্তমানে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকার ২১টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আরও ২০টি প্রকল্প। এত বিপুল বিনিয়োগের পরও পানি পরিষ্কার হয়নি, স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরেনি এবং নাব্যতার সমস্যাও কাটেনি। ফলে প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ও অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ বড় হলেই যে নগরবাসী সুফল পাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। কাজের ফলাফল দৃশ্যমান না হলে সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হিসেবেই বিবেচিত হবে। মূল সমস্যা প্রকল্পের সংখ্যায় নয়, পরিকল্পনার বিচ্ছিন্নতায়। বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের মতো করে কাজ করায় একই জলাশয়ে পরস্পরবিরোধী কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে। কোথাও দৃষ্টিনন্দন হাঁটার পথ নির্মাণ করা হচ্ছে, অথচ পাশের নালা দিয়ে অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য নদীতে পড়ছে। কোনো সংস্থা খাল খনন করছে, আবার অন্য কোনো প্রকল্পের অবকাঠামো সেই খালের প্রবাহ সংকুচিত করছে। নদীকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা না করে শুধু তীর উন্নয়ন বা সৌন্দর্যবর্ধনে অর্থ ব্যয় করলে দূষণ ও জলাবদ্ধতার মূল কারণ অক্ষতই থেকে যাবে। সরকার চলমান ও প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো পর্যালোচনার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটিকে ফলপ্রসূ করতে হলে প্রতিটি প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়, অগ্রগতি ও পরিবেশগত ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করে সব দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে একটি অভিন্ন মহাপরিকল্পনার অধীনে আনতে হবে। পরিকল্পনা অনুমোদনের আগে নদীর প্রবাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দখল পরিস্থিতি ও স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
