Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

হাতি সুরক্ষায় বনের অবক্ষয় রোধ করা প্রয়োজন

asif

asif

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১০:১০ পিএম

হাতি সুরক্ষায় বনের অবক্ষয় রোধ করা প্রয়োজন

প্রকাশ ঘোষ বিধান
পৃথিবীর স্থলপ্রাণীদের মধ্যে সর্ববৃহৎ প্রাণী হাতি। তবে ক্রমাগত আবসস্থল ধ্বংস, খাদ্যাভাব এবং মানুষের সাথে দ্বন্ধে দিন দিন হাতির সংখ্যা কমছে। প্রকৃতির বড় বন্ধু হাতি হুমকির মুখে। প্রকৃতির এ বন্ধুকে সঙ্কটাপন্ন প্রাণী হিসাবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। সারা বিশে^ এশিয়ার হাতির সংখ্যা ৩৫ থেকে ৪০ হাজার দাবি করা হলেও বাংলাদেশে এ সংখ্যা ২শত এর বেশি হবে না। হাতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানুষের হানা ও প্রকৃতিতে খাদ্য সংকটের কারণে হাতির সংখ্যা দিন দিন কমছে।

১৩ আগস্ট বিশ^ হাতি দিবস। হাতি সংরক্ষণের জন্য জনসচেতনতা তৈরি করতে প্রতি বছর পালন করা হয় বিশ^ হাতি দিবস। বাংলাদেশের বন বিভাগ সহ বিভিন্ন সংগঠন দিবসটি পালন করে থাকে। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য জনসচেতনতা তৈরি করা। পৃথিবীতে দুই প্রজাতির হাতি আছে। এশিয়ান হাতি ও আফ্রিকান হাতি। যদিও শারিরীকভাবে দেখতে প্রায় একই রকম, তবুও এদের মধ্যে জৈবিক পার্থক্য রয়েছে। এশিয়ান হাতি সাধারণত লম্বায় ৬ থেকে ১১ ফুট হয়ে থাকে আর আফ্রিকান হাতির ৬ থেকে ১৩ ফুট। এশিয়ান হাতির ওজন ২ থেকে ৫ টন আর আফ্রিকান হাতির ওজন ২ থেকে ৭ টন। এশিয়ান হাতির কান ছোট আর আফ্রিকান হাতির কান বড়। এশিয়ান হাতির বুকের হাড় ২০ জোড়া আর আফ্রিকান হাতির বুকের হাড় ২১ জোড়া। আফ্রিকান হাতির স্ত্রী-পুরুষ উভয় হাতির প্রলম্বিত দাঁত আছে আর এশিয়ান হাতির ক্ষেত্রে শুধু পুরুষের দাঁত আছে। হাতি প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বছর বাঁচে।

বাংলাদেশের স্থায়ী বন্য হাতির আবাসস্থল হচ্ছে- চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবন, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি। এর মধ্যে চট্টগ্রামের চন্দনাইনা, বাঁশখালী, পটিয়া ও রাঙ্গুনিয়া। কক্সবাজারের কাসিয়াখালি, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ। বান্দরবনের লামা ও আলিকদম। রাঙ্গামাটির কাউখালি, কাপ্তাই ও লংদু এবং খাড়গাছড়িসহ দেশের ১১টি বন বিভাগে এদের বিচারণ করতে দেখা যায়। ড. রেজা খানের জরিপ অনুযায়ী ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে ৩৮০টি বন্য হাতি ছিল। ২০০০ সালে ওয়ার্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ডের গবেষণা অনুযায়ী ২৩৯টি। সর্বশেষ ২০০৪ সালে আইইউসিএনের জরিপে পাওয়া যায় ২২৭টি হাতি। উল্লেখিত পরিসংখ্যান থেকে বোঝাযায় বাংলাদেশে হাতি সংখ্যা দিন দিন কমছে। আর অভিবাসি হাতির সংখ্যা ৮৪ থেকে ১০০টি।

৯টি কারণে বাংলাদেশে হাতি কমছে। আইইউসিএনের গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখিত কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বনাঞ্চল নিচিহ্ন হয়ে যাওয়া, খাদ্যা সংকট, চলাচলের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া, যত্রতত্র জনবসতি গড়ে ওঠা এবং চোরাশিকারী নিষ্ঠুরতা সহ আরো কয়েকটি কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ, চিন, ভারত, ভূটান, ও ইন্দোনেশিয়ায় এশিয়ান হাতির দেখা মেলে। বর্তমানে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার এশিয়ান হাতি এবং ৩৫ থেকে ৪০ লাখ আফ্রিকান হাতি রয়েছে। কিন্তু ১শত বছর আগে আফ্রিকান হাতির মোট সংখ্যা ছিল এক কোটির উপরে। গত ১০ বছরে ৬২ ভাগ হাতি কমেছে। বন উজাড় ও হাতির দাঁতের জন্য শিকারীদের হাতে নিহত হওয়ায় হাতি কমার অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়ান ২০১২ সালে প্রকাশিত তথ্য মতে ২০০৩ থেকে ২০১২ সাল এই ১০ বছরে মানুষের হাতে ৪৭টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

মানুষ নানা কারণে বনজঙ্গল উজাড় করছে। আবাদি জমি বাড়াতে বন ধ্বংস করা হচ্ছে। মানুষ জীবন জীবিকার জন্য বনের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়াতে বন্য প্রাণীর উপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। মানুষ ও হাতির মধ্য চলামান বিরোধ নিরসনে হাতির আবাসস্থল বন-জঙ্গল উজাড় করা বন্ধ করতে হবে। বনে হাতির আবাসস্থলে নিরুপদ্রব বিচারণ এবং খাদ্য সংকট নিরসন করতে পারলে হাতির সুরক্ষা অনেকাংশে সম্ভব হবে। এছাড়াও জনসচেতনতা রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

বন উজাড় হওয়ার কারণে হাতিরা তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারাচ্ছে। বনের সীমানা রক্ষা করলে হাতিরা নিরাপদে থাকতে পারে। একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রচুর খাবার ও পানির প্রয়োজন হয়। বনের অবক্ষয় রোধ করলে হাতিরা বনের ভেতরেই পর্যাপ্ত বাঁশ, কলাগাছ ও প্রাকৃতিক জলাশয় পাবে। বন কমে যাওয়ায় হাতিরা খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। এর ফলে ফসল নষ্ট হয় এবং মানুষ ও হাতি উভয়েরই প্রাণহানি ঘটে। বনের ঘনত্ব বাড়ালে এই সংঘাত কমে আসবে। হাতিরা এক বন থেকে অন্য বনে যাতায়াতের জন্য নির্দিষ্ট পথ বা করিডোর ব্যবহার করে। বনের অবক্ষয় রোধ করে এই করিডোরগুলো সুরক্ষিত রাখা জরুরি।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং হাতি শিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। বনের অবক্ষয় রোধ শুধুমাত্র হাতি নয়, বরং পুরো জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
 

সম্পর্কিত খবর

স্ক্রিনের ওপারে কেমন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে শিশুদের?

স্ক্রিনের ওপারে কেমন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে শিশুদের?

অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

স্বাস্থ্য খাতে কী ঝুঁকি তৈরি করছে এআই

স্বাস্থ্য খাতে কী ঝুঁকি তৈরি করছে এআই

যৌন সহিংসতা রোধে আলেমদের ভূমিকা

যৌন সহিংসতা রোধে আলেমদের ভূমিকা

মাদ্রাসা শিক্ষা: অনাচার ও আত্মশুদ্ধির দায়

মাদ্রাসা শিক্ষা: অনাচার ও আত্মশুদ্ধির দায়

গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধে প্রয়োজন তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা

গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধে প্রয়োজন তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা

Logo

সম্পাদক : এস.এম জাহিদ আনোয়ার শামীম