রাজু আহমেদ
সমস্যাটি এখন ভিন্ন দিকে গড়াচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় গোটা মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকেই দোষারোপ করা আরম্ভ হয়েছে। এতে যেমন রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির ব্যাপার আছে, তেমনি আছে বিদেশি এজেন্ডাও। বাংলাদেশে যিনি নিজেকে পিওর নাস্তিক বলে দাবি করছেন, তাঁর মধ্যেও আছে পূর্ণাঙ্গ ইসলামবিদ্বেষ। ধর্মশিক্ষা, হুজুর-এসবের ওপর কারো কারো অ্যালার্জি আজন্মকালের। মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার মৌলভি কিংবা বাড়িতে বাড়িতে আমপারা এবং মৌলুদ শরীফ পড়ানো মুনশির মর্যাদা এখানে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকের! হুজুরদের প্রয়োজন হয় নিকাহে এবং জানাজায়! বাকি সময় তাঁরা উপেক্ষিত থাকেন।
মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপারে বড় বড় গোষ্ঠীর বিরোধিতা আছে। প্রণীত সর্বশেষ শিক্ষানীতিতেও একমুখী শিক্ষার কথা বলে মাদ্রাসা শিক্ষাকে কার্যত কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। তবে এটাও সত্য যে, কিন্ডারগার্টেন, নূরানী মাদ্রাসা এবং কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস ও কারিকুলাম কতটা যুগোপযোগী, কতখানি মানসম্মত, তা খতিয়ে দেখাও দরকার। সরকারও এক্ষেত্রে মাঝে মাঝে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। যারা দানের টাকায়, সদকা ও যাকাতের টাকায়, বিদেশিদের টাকায় পরিচালিত, তারা অন্যকে কৈফিয়ত দিতে কতটা বাধ্য-সেটাও প্রশ্ন। কারো সনদকে কেবল স্বীকৃতি দিলেই সেটা সত্যিকারার্থে এবং বাস্তবিকপক্ষে সমমান হয়ে ওঠে না।
কিছু কিছু মাদ্রাসার কতিপয় শিক্ষক অনৈতিকতার সঙ্গে জড়িয়েছেন। তাঁদের চারিত্রিক অবদমনের দায়ভার বয়ে বেড়াতে হচ্ছে গোটা মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যারা জড়িত, তাঁদের সবাইকে। সমস্যা আসলে বহুমাত্রিক। প্রথমত, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তাঁদের বিচারের মুখোমুখি না করে, শাস্তি না দিয়ে বরং তাঁদের পক্ষে সাফাই গাওয়ায় প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, কারো বিরুদ্ধে যখন কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে, তখন সেটা চাপানো হয় গোটা ব্যবস্থার সঙ্গে যারা জড়িত, তাঁদের সবার ওপর। যে কারণে কোনো অভিযোগের বিপরীতে সুষ্ঠু সুরাহা না হয়ে বরং অপরাধ মূলে ও কা-ে বাড়তে থাকে। কথিত আছে, বাঙালিয়ানায় দ্বিচারিতা সেকেলে স্বভাব। যারা অন্যের অন্যায়ে সরব হয়, তারা নিজেদের অন্যায়ে নীরব থাকছে। আলেম সমাজের একাংশও এই দ্বিচারিতায় ভুগছে।
অতীতের একটা সময় মাদ্রাসায় কেবল পিছিয়ে থাকা শ্রেণির ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করত। কেননা সেখানে থাকা-খাওয়া প্রায় ফ্রি ছিল। ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষার বিনিময়ে যদি কিছু পরিশোধ করতে হতো, তাও খুবই সামান্য অঙ্কের ছিল। যা বহনের সামর্থ্য সমাজের সেই শ্রেণির জন্যও অসম্ভব ছিল না। তবে এখন সময় বদলেছে। কিছু কিছু মাদ্রাসায় শিক্ষার খরচ অনেক জেনারেল প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বেশি। মানসম্মত এবং যুগোপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত হওয়ার কারণে সমাজের ধনাঢ্য, শিক্ষিত এবং অভিজাত শ্রেণির অনেক ছেলেমেয়ে এখন মাদ্রাসায় পড়ে। সামাজিক সমস্যা বিশ্লেষণের পরে একথাও স্বীকৃত হয়েছে যে, মোরাল ডিগনিটিতে মাদ্রাসায় পড়–য়ারা অন্যদের চেয়ে এখনও আংশিক হলেও এগিয়ে আছে। যদিও এ বিষয়ে এখন গবেষণা হওয়ার দাবি রাখে।
শহর-নগরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ করে এগিয়ে যাচ্ছে ধর্মীয় পদ্ধতির শিশু শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। বাহারি বিজ্ঞাপন এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। যদি সেকেলে চিন্তা করা হতো, তাহলে এই পদ্ধতির শিক্ষার সম্প্রসারণ পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলে বেশি হওয়া আবশ্যক ছিল। অথচ গ্রামের চেয়ে শহরে মাদ্রাসা, নূরানী মাদ্রাসা এখন সংখ্যাধিক্য। মানুষের মানসিকতা যেমন বদলেছে, তেমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন সময়সূচি এবং ছুটির বর্ষপঞ্জিও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। সরকারি এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দায়িত্ব এবং আন্তরিকতার প্রশ্নটিও সামনে আনছে। অথচ বেতনের পার্থক্য আকাশ-ছায়াপথের দূরত্বের।
মাদ্রাসা শিক্ষায় অনাচার হচ্ছে না-এটা অস্বীকারের সাধ্য এখন আর নেই। তবে এটা সমাজের সামগ্রিক চরিত্রহীনতা ও নৈতিক সংকটের আংশিক রূপ। জাতীয়ভাবেই আমাদের চারিত্রিক এবং নৈতিক সংকট তীব্রতর হয়ে চলছে। শিশু নির্যাতন, নিপীড়ন এবং ধর্ষণ যদি শক্ত হাতে দমন করা না যায়, তবে মাদ্রাসা তো দূরের কথা, ভবিষ্যতে মসজিদ-মন্দিরের পবিত্রতাও রক্ষা পাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান আছি। নেশার বেড়াজালে গোটা সমাজব্যবস্থা ডুবে আছে। জুয়ার জাল সর্বত্র বিস্তৃত হয়েছে। এসব থেকে সন্তানকে মুক্ত রাখতে এখনও মাদ্রাসা শিক্ষাই উল্লেখযোগ্য বিকল্প। সেখানেও যে সংক্রমণ ঘটেনি, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, তবে তুলনামূলক বিবেচনায় এখনও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে যায়নি। অভিভাবকগণ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা খুঁজে পেতে সন্তানকে ধর্মশিক্ষা দিতে ঝুঁকছেন।
ইসলামিক স্কলার ও ভাবাদর্শের ব্যক্তিবর্গকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষার দুর্নামে যাদের অংশগ্রহণ আছে, তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। শিক্ষকের শিক্ষার্থীদের বাবার মতো, ভাইয়ের মতো হওয়ার দরকার নেই। শিক্ষককে তাঁর সীমা জানতে ও মানতে হবে। আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে লিঙ্গভেদে শিক্ষকদেরও লিঙ্গভেদ করতে হবে। মহিলা দিয়েই মহিলা মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত করতে হবে। দুনিয়া ও আখেরাতের বিবেচনায় ধর্মশিক্ষা আবশ্যকীয়। কিন্তু ধর্মশিক্ষার আয়োজন করে যদি সেখানে অধর্মের কার্যকলাপ হয়, তবে তা কঠিন হস্তে দমন করাও ধর্মনির্ধারিত দায়িত্ব। আইনকে এ ব্যাপারে স্বাধীনভাবে প্রয়োগ হতে দিতে হবে। অপরাধীকে অপরাধের বিবেচনায় বিচার করতে হবে। কে মৌলভি, কে সমাজে সম্মানিত, সেটা বিবেচনা করে অপরাধ প্রতিহত করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বিচার করতে হবে অপরাধের; অপরাধীর পরিচয় বিবেচনায় নয়।
মাদ্রাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার, তা হাওয়ায় বাড়তে দেওয়া যাবে না। ধর্মের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে ইসলামের বিরুদ্ধে একটা গোষ্ঠী গুজব-অপতথ্য রটাতে সদা তৎপর। সেই কুচক্রী মহলকে কোনো সুযোগ দিতে না চাইলে নিজেদের মধ্যে থাকা দোষ ও ভুলগুলো স্ব-উদ্যোগে শুধরে নেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। আলেমদের আত্মসমালোচনা করা খুব জরুরি। এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল মহলকে আরও করিৎকর্মা হতে হবে। ধর্মীয় আবেগে, আলেমদের মর্যাদা অন্য সকল মানুষের থেকে বেশি। যাদের মর্যাদা শানিত, তাদের দোষের ধকলও বেশি। কাজেই সিরাতের ও সুরতের মর্যাদা রক্ষায় অন্তর্নিহিত তাকওয়া অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। এরপরেও যাদের চিত্তকে শয়তান দখল করে নেয়, বিবেকের বিশুদ্ধতা যাদেরকে মানুষ বানাতে পারে না-তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। সেই শাস্তি অবশ্যই ধর্ম না জানা মানুষের চেয়ে বেশি এবং জোরালো হওয়া আবশ্যক। যাদের কাছে প্রত্যাশা বেশি, তারা তা রক্ষায় ব্যর্থ হলে তাদের প্রতি ঘৃণার আধিক্যও বেশি। ধার্মিকদের চলার পথ মসৃণ নয়। প্রতি পদে পদে তাদেরকে সচেতন থাকতে হবে। কারো পদচ্যুতি ঘটলে তাকে শোধরাতে সর্বোচ্চ কঠোর পন্থা বেছে নিতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
মুক্তমত ২
এমন সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ আগামীতেও অটুট থাকুক
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব আয়োজন কেমন ছিল, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্য থেকে তা অনুধাবন করা যায়। তিনি বলেছেন, ‘অত্যন্ত আনন্দমুখর, আনন্দঘন ও বর্ণিল পরিবেশে বাংলাদেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। আমি বাংলাদেশের এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে দুদেশের মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও মেলবন্ধন দেখতে পেয়েছি।’ পূজাম-পে উপস্থিত হয়ে তিনি বলেন, আমি এখানে রাষ্ট্রদূত হিসাবে আসিনি, এসেছি পরিবারের সদস্য হিসাবে আনন্দ ভাগাভাগি করতে।’ দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া ব্যবস্থায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
দুর্গাপূজা যাতে নির্বিঘেœ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে সে বিষয়ে দৃষ্টি রেখেছেন। অতীতে দেশের সরকারপ্রধান রাজধানীর ঢাকেশ^রী মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন অথবা বনানীতে গিয়ে পূজাম-প পরিদর্শন করে পুণ্যার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন; কিন্তু সেই ধারার ব্যত্যয় ঘটিয়ে এবারই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ঢাকার বাইরে তিনটি জেলা শহরে গিয়ে উপস্থিত হয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে দুর্গোৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন। রাজধানী থেকে বহুদূরে রংপুর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে গিয়ে তিনি পূজাম-প পরিদর্শন করেছেন। রাজধানীর বাইরে গিয়ে জেলা শহরে পূজাম-পে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বিনিময় সাধারণ কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা; এবং রাষ্ট্রীয় মনস্তত্ত্বে বড় এক পরিবর্তনের বার্তা। এতে প্রান্তিক বা মফস্বলের নাগরিকরাও অনুধাবন করতে পেরেছেন, রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে। ভোটব্যাংকের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সবার প্রতি সমআচরণের এ সংস্কৃতি নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকেই নির্দেশ করে। মফস্বলের পুণ্যার্থীরা তাদের মাঝে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে যারপরনাই বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছেন। পূজাম-পে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তাদের পূজার আনন্দ অনেকটাই বেড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিষয়টি বেশ উপভোগ করেছেন।
‘সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ সবার’-এ কথাটি শুধু প্রবচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের পদক্ষেপগুলো আলোচনার দাবি রাখে। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সরকার দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে আর্থিক অনুদানের পরিমাণ প্রায় এক কোটি টাকা বাড়িয়েছে। এতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসব পালনে অনেকটাই সুবিধা হয়। এছাড়া ম-পপ্রতি বরাদ্দকৃত চালের পরিমাণ ৬০০ কেজি করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এবং আওয়ামী লীগ আমলে ম-পপ্রতি চাল বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৫০০ কেজি। পূজা উদ্যাপন পরিষদ অনেক দিন ধরেই পূজার ছুটি বাড়িয়ে দুই দিনের পরিবর্তে তিন দিন করার দাবি জানিয়ে আসছিল। এবারই প্রথম দুর্গাপূজার ছুটি দুই দিনের পরিবর্তে তিন দিন করা হয়েছে। এর সঙ্গে দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি যোগ হওয়ায় মোট ছুটি দাঁড়িয়েছে পাঁচ দিন। এবারই প্রথম বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় শারদীয় দুর্গোৎসব পালনের জন্য কার্যত পাঁচ দিন ছুটি পেয়েছেন। এর ফলে সবাই আনন্দের সঙ্গে পূজার ছুটি উপভোগ করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেক পরিবার গ্রামে গিয়েছেন আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে পূজার ছুটি উপভোগ করার জন্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্য যে কোনো বছরের তুলনায় ভালো থাকায় তাদের কোনো উদ্বেগ নিয়ে সময় কাটাতে হয়নি।
শারদীয় উৎসবের আনন্দ ও উপলব্ধি শুধু ঢাকের বাদ্য কিংবা প্রতিমা বিসর্জনের দীর্ঘশ^াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে একটি সমাজের সামগ্রিক আস্থার মধ্যে। সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু-এই কৃত্রিম বিভাজনের দেওয়াল ভেঙে ধর্মীয় আনন্দ উৎসবগুলো মানুষকে এককাতারে নিয়ে আসে। উল্লেখ্য, প্রতিটি ধর্মের আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শুধু আনন্দ লাভ করা নয়; ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলা এবং দৃঢ় করাই এর মূল লক্ষ্য। কোনো ধর্মই তার অনুসারীদের অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি বিরূপ আচরণ করতে শেখায় না; তবে কিছু মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধের অপব্যবহার করে বলেই বিভেদ ও সংঘাত সৃষ্টি হয়।
আমাদের দেশে একটি কথা বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, তা হলো, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। অর্থাৎ যে যেই ধর্ম অনুসরণ করুন না কেন, ধর্মীয় আনন্দ আয়োজনে সবাই অংশগ্রহণ করে। সব ধর্মের আনন্দ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজের সব মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলা। বাংলাদেশ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একটি উদার ও আধুনিক রাষ্ট্র। এ দেশের মানুষ স্মরণাতীত কাল থেকে প্রীতি ও আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দিন যাপন করছে। তবে মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে মহলবিশেষ ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করে থাকে। সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি নেই। মাঝেমধ্যে রাজনীতিক ও সমাজপতিরা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতা উসকে দেয়। এদের ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব আমাদের শিখিয়েছে, মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকলে কীভাবে সব অনিয়ম-দুষ্কর্ম প্রতিরোধ করা যায়।
বাংলাদেশে স্মরণাতীতকাল থেকে বিভিন্ন ধর্ম-পেশার মানুষ পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করে আসছে। নতুন প্রজন্মের মাঝে এ চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে নিজের ধর্ম বিশ^াসের ওপর অটল থাকার পাশাপাশি অন্যের ধর্মমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক মানুষকে বুঝতে হবে, আমার যেমন নিজ ধর্মচর্চার অধিকার আছে, তেমনি অন্য ধর্মের অনুসারীরও তার নিজ ধর্মচর্চা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। আমি সব ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করব; কিন্তু তাতে অন্য ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার যেন খর্ব না হয়। স্বাধীনতার অর্থ স্বেচ্ছাচারিতা নয়, স্বাধীনতার অর্থ দায়িত্বশীলতা। আমাদের এমনভাবে স্বাধীনতা ভোগ করতে হবে, যাতে এর দ্বারা অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
একে অপরের সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা জানানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় নেতাদের তৎপরতা শুধু উপাসনালয়ে সীমিত না রেখে সামাজিক সম্প্রীতি গড়ার ক্ষেত্রে বিস্তৃত করতে হবে। তাদের নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের আত্মীক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের নিয়ে এলাকাভিত্তিক সামাজিক সম্প্রীতি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এ কমিটির উদ্দেশ্য হবে কোনো এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার উপক্রম হলে তাৎক্ষণিকভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তা নিরসন করা। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে; যাতে কেউ গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত হতে না পারে।
এবারের দুর্গোৎসব ঘিরে যে আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তার মূল কারণ হচ্ছে, অন্য ধর্মের অনুসারীরা মনেপ্রাণে কামনা করেছিল, দুর্গোৎসব যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এ নিরপেক্ষ ধর্মীয় চেতনাবোধ আমাদের রাজনৈতিক জীবনেও অনুসরণ করতে হবে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর এক নদী রক্তের বিনিময়ে চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছে। এ যাত্রাপথ মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। আগামীর বাংলাদেশকে সঠিক ও অসাম্প্রদায়িকভাবে পরিচালিত করতে হলে সবার মধ্যে অসাম্প্রদায়িক মনোভাব জাগ্রত করতে হবে। এ মুহূর্তে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজন। এজন্য সরকার এবং সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দলগুলো যখন কোনো ইস্যুতে সরকারের বিরোধিতা করবে, তখন তা কোনো অজুহাতেই উপেক্ষা করা ঠিক হবে না; বরং আলোচনার টেবিলে বসে সম্প্রীতিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালাতে হবে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে এমন কোনো সমস্যা নেই, যা আলোচনার টেবিলে সৌহার্দপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায় না। বাংলাদেশ যে নতুন বন্দোবস্তের দিকে এগিয়ে চলেছে, তা সফল করতে হলে সবাইকে একতাবদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যেতে হবে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়-এই চূড়ান্ত বিষয়টি আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে।
সবশেষে বলব, এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব যেভাবে আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে, তা অনুসরণ করে জাতীয় জীবনেও ঐক্য ও সংহতি গড়ে তুলতে হবে। বাঙালি জাতি যখনই একতাবদ্ধ হয়েছে, তখন বিশে^র কোনো শক্তিই তাদের পরাস্ত করতে পারেনি। যখনই জাতি বিভক্ত হয়েছে, তখনই অপশক্তি পেছন থেকে এসে আমাদের ললাটে পরাজয়ের কলঙ্ক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। আমরা আর ভুল করতে চাই না। আমাদের সব চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে জাতীয় স্বার্থকে।
এবারের দুর্গোৎসব যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে, আমি কামনা করি, এ সুন্দর ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ আগামীতেও অব্যাহত থাকুক। ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে এ সম্প্রীতির বন্ধন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
লেখক : প্রফেসর ইমেরিটাস; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়; বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত
