জমিদার-বনেদি পরিবারের আঙিনা থেকে বেরিয়ে সর্বজনীন রূপে দুর্গাপূজা
asif
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৯ পিএম
প্রকাশ ঘোষ বিধান
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার রূপান্তর এক দীর্ঘ এবং চিত্তাকর্ষক ইতিহাস। জমিদার বাড়ির দালান আর বনেদি পরিবারের আঙিনা থেকে বেরিয়ে দুর্গাপূজা আজ রূপ নিয়েছে সর্বজনীন উৎসবে, যা বাঙালি সংস্কৃতির এক মহত্তম বিবর্তন।
প্রাচীনকালে দুর্গাপূজা ছিল মূলত ধনী, বিত্তশালী এবং জমিদারদের পারিবারিক উৎসব। ১৬১০ সালে কলকাতার বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজো এবং পরবর্তীতে শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেবের পুজো এর বড় উদাহরণ। এসব পুজোয় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত, মূলত বাবু সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রতিপত্তি প্রদর্শনের মাধ্যম ছিল এই উৎসব।
সেই সময়ের দুর্গাপূজার সঙ্গে পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে বিষয়টি গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। পূজাকে ঘিরে আয়োজন, অতিথি আপ্যায়ন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং জাঁকজমক ছিল অভিজাত পরিবারের সামাজিক অবস্থান প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। ফলে দুর্গাপূজা ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির সামাজিক পরিচয়েরও প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
জমিদারদের এই একাধিপত্য ভাঙতেই জন্ম নেয় বারোয়ারি পুজো। বারোয়ারি শব্দটির উৎপত্তি বারো ইয়ার বা ১২ জন বন্ধু থেকে। ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারো জন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে যে বারো-ইয়ারি বা বারোয়ারি পূজার সূচনা করেছিলেন, সময়ের নিয়মে তা-ই আজ বিশ^মঞ্চে ইউনেসকোর হেরিটেজ স্বীকৃতি পাওয়া সর্বজনীন শারদোৎসবে পরিণত হয়েছে।
শুরুতে দুর্গাপূজা ছিল মূলত রাজা, মহারাজা এবং প্রভাবশালী জমিদারদের আভিজাত্য প্রকাশের মাধ্যম। সাধারণ মানুষের সেখানে প্রবেশাধিকার থাকলেও, পূজা আয়োজনে তাদের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল না। এটি ছিল মূলত ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্তরের উৎসব।
জমিদারদের একক আধিপত্য ভেঙে ১৭৯০ সালে গুপ্তিপাড়ায় বারো জন বন্ধু মিলে প্রথম সমবেতভাবে চাঁদা তুলে পূজা শুরু করেন। এই বারো-ইয়ারি শব্দ থেকেই বারোয়ারি শব্দের উৎপত্তি। এর ফলে দুর্গাপূজা প্রথম সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় এবং সর্বসাধারণের অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত হয়।
জমিদার বাড়ির পুজোয় অংশ নিতে না পেরে তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে এই বিকল্প আয়োজন করেন।বারোয়ারি পূজা সমষ্টিগত হলেও শুরুর দিকে সমাজের সব স্তরের মানুষের সমান অধিকার বা অবারিত প্রবেশ সব জায়গায় ছিল না। এটি পারিবারিক গ-ি থেকে পুজোকে বাইরে এনেছিল বটে, কিন্তু তখনও সমাজের সব স্তরের মানুষের সমান অধিকার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এখানে ছিল না।
তবে বারোয়ারি পূজার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল পূজার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি সম্পৃক্ততা। একক পরিবারের অর্থ ও সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বহু মানুষের অংশগ্রহণ, চাঁদা সংগ্রহ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ ধীরে ধীরে পূজার চরিত্র বদলে দেয়। এখান থেকেই পরবর্তী সময়ে পাড়াভিত্তিক পূজা, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং বৃহত্তর সামাজিক অংশগ্রহণের ভিত্তি তৈরি হয়।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে,১৯১০ সালে কলকাতার ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাট রোডে ধর্মোৎসাহিনী সভা প্রথম আনুষ্ঠানিক সর্বজনীন দুর্গাপূজার আয়োজন করে। বিশেষ করে ১৯১৯ সালে কলকাতার বাগবাজারের (তৎকালীন নেবুবাগান) পূজায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য ম-প উন্মুক্ত করা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের আবহে এই পূজাই সর্বজনীন দুর্গোৎসব নামে পরিচিতি পায়, যা ছিল আক্ষরিক অর্থেই সবার উৎসব। বিংশ শতকের শুরুতে বারোয়ারি রূপটি আরও গণতান্ত্রিক হয়ে সর্বজনীন রূপ ধারণ করে, যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণি নির্বিশেষে সমাজের প্রতিটি মানুষের স্থান নিশ্চিত হয়।
সর্বজনীন পূজার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপূজা শুধু পূজাম-পের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ম-পসজ্জা, প্রতিমা নির্মাণ, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক কর্মকা-ও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ফলে একটি ধর্মীয় উৎসব ক্রমে বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বারোয়ারি এবং সর্বজনীন শব্দ দুটিকে অনেকে এক করে ফেললেও, ইতিহাসের পাতায় বারোয়ারি পুজো ছিল সর্বজনীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম শক্তিশালী ধাপ। বিংশ শতকের শুরুতে বারোয়ারি রূপটি আরও গণতান্ত্রিক হয়ে সর্বজনীন রূপ ধারণ করে, যেখানে সনাতনীদের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণি নির্বিশেষে সমাজের প্রতিটি মানুষের স্থান নিশ্চিত হয়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বাংলায় অভিজাত ও বিত্তশালী জমিদারদের প্রভাব কমতে শুরু করলে বারোয়ারি পুজো পূর্ণাঙ্গভাবে সর্বজনীন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বারোয়ারি পুজোয় মূলত উদ্যোক্তা ও চাঁদাদাতাদের প্রাধান্য থাকত, কিন্তু সর্বজনীন শব্দটির অর্থ হলো-যা সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদ থাকে না।
দেশভাগের পর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো জমিদারকেন্দ্রিক পূজার পাশাপাশি পাড়াভিত্তিক ও সংগঠননির্ভর পূজার বিস্তার ঘটে। এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ আরও বাড়ে। পরবর্তী সময়ে শহর থেকে গ্রাম-সব জায়গায় সর্বজনীন পূজা স্থানীয় মানুষের মিলন, সহযোগিতা ও সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম বড় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
আজকের সর্বজনীন পূজা আর কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বিশ^ বাঙালিকে এক সুতোয় বাঁধার এক বিশাল সামাজিক উৎসব এবং এক অপরূপ প্রকাশ্য আর্ট গ্যালারি।
দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী বাঙালিরাও এখন দুর্গাপূজাকে ঘিরে নানা আয়োজন করেন। প্রবাসে থাকা মানুষদের কাছে এই উৎসব শিকড় ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে দুর্গাপূজার সর্বজনীন রূপ শুধু একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং সময়ের সঙ্গে বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও এক চলমান বিবর্তন।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
