এফএনএস ধর্মপাতা : প্রাক-ইসলামী যুগে নারীদের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন মর্যাদা স্বীকৃত ছিল না। সে যুগে কন্যাসন্তান জন্মদান ছিল পিতা-মাতার জন্য অপমানজনক। কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করলে পিতা-মাতার মুখ দুঃখে বিবর্ণ হয়ে যেত এবং তাদের জীবন্ত কবর দিত। মহান আল্লাহতায়ালা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তাদের কাউকে যখন কন্যা জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়, তাদের চেহারা কালো ছায়ায় মলিন হয়ে যায় এবং তারা হয়ে যায় মর্মাহত। তাকে যে সংবাদ দেয়া হল, তাতে লজ্জায় সে সমাজের লোকদের থেকে পালিয়ে বেড়ায়। সে ভাবে সে কি এ অপমান সইয়ে চলবে, নাকি তাকে মাটির নিচে লুকিয়ে ফেলবে। বুঝে দেখ! কি মন্দ সিদ্ধান্ত সে নিচ্ছে।’ [সূরা নাহল : ৫৮-৫৯]
সূরা তাকভিরে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে? [সূরা তাকভীর : ৮-৯]
আধুনিক সভ্যতার যুগে কন্যাসন্তানকে জাহেলি যুগের মতো যদিও জীবন্ত কবর দেয়া হচ্ছে না ঠিক; কিন্তু জন্মের আগেই ডিজিটাল কায়দায় ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে কন্যা ভ্রƒণ হত্যা করা হচ্ছে, যা জীবন্ত হত্যারই শামিল। আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা কর না, আমিই তাদের রিজিক প্রদান করি এবং তোমাদেরও।’ [সূরা বনি ইসরাইল-৩১]
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় শুধু কন্যাসন্তান নয়, সব ধরনের সন্তান হত্যা ইসলামে নিষিদ্ধ। কেননা সব জীবের রিজিক তিনিই দিয়ে থাকেন।
আজও কোন কোন পিতা-মাতা কন্যাসন্তান লাভ করলে তাদের মধ্যে এক ধরনের মনোকষ্ট দেখা যায়। আর পুত্রসন্তান লাভ করেলে পিতা-মাতা আনন্দে আÍহারা হয়ে ওঠেন। এমনকি পুত্রসন্তান লাভের আশায় কিছু কিছু পিতা-মাতাকে পীরবাবা, মাজার ও কবিরাজের শরণাপন্ন হতে দেখা যায়, যা শেরেকি এবং ভ্রান্ত ধারণা বৈ কিছুই নয়।
আবার কোথাও কন্যাসন্তান জন্মদান করার কারণে স্ত্রীকে দোষারোপ করা হয়ে থাকে এবং কন্যাসন্তান জন্মদানের কারণে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের ঘটনাও লক্ষ্য করা যায়।
অথচ ছেলে ও কন্যাসন্তান দান আল্লাহতায়ালার একান্ত ইচ্ছা।
তিনি বলেন, ‘আসমান জমিনের সার্বভৌম বাদশাহী একমাত্র আল্লাহতায়ালার। তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা তাকে তিনি কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা তাকে পুত্রসন্তান দান করেন, আবার যাকে ইচ্ছা নিঃসন্তান করেন। তিনি মহাজ্ঞানী ও সর্বশক্তিমান। [সূরা আশ-শূরা : ৪৯-৫০] ইসলামে কন্যাসন্তান লালন-পালনে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রথম সন্তান যাদের কন্যা, তারা হল ভাগ্যবান পিতা-মাতা।’
রাসূলুল্লাহ (সা.) এও বলেছেন, ‘তোমরা কন্যাদের ঘৃণা কর না, কেননা আমি নিজেই কন্যাদের পিতা।’
ইসলামে কন্যাসন্তান জন্মদানকারী পিতা-মাতাকে ভাগ্যবান এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। আমরা যদি অন্য ধর্মের দিকে দৃষ্টি দিই সেখানে নারীদের বিভিন্নভাবে বিষো গার করা হয়েছে।
নবীজী বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির একটি কন্যা বা বোন আছে এবং তাদের জীবন্ত কবর দেয়নি, অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্য করেনি আর পুত্রসন্তানকে কন্যা সন্তানের ওপর প্রাধান্য দেয়নি, সে জান্নাতি।’ [সুনানে আবু দাউদ]
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার দুটি কন্যাকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সুন্দরভাবে লালন-পালন করেছে, শিক্ষিত করেছে এবং সৎ পাত্রে পাত্রস্থ করেছে কিয়ামতে সে আর আমি একত্রে থাকব।’ [সহিহ্ মুসলিম]
কন্যাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ আরও বলেছেন, ‘যখন কারও গৃহে কন্যা জন্মগ্রহণ করে, আল্লাহ সেখানে ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তারা এসে বলে, হে গৃহের বাসিন্দারা, তোমাদের ওপর সালাম। ফেরেশতারা ভূমিষ্ট কন্যাকে নিজের পাখার ছায়াতলে নিয়ে নেন এবং তার মাথার ওপর নিজের হাত রেখে বলতে থাকে, এটা একটি দুর্বল দেহ যা একটি দুর্বল জীবন থেকে জন্ম নিয়েছে। যে ব্যক্তি এ দুর্বল জীবনের প্রতিপালনের দায়িত্ব নেবে কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্য তার সঙ্গে থাকবে। [মুজামুস সগির]
কন্যাসন্তান লালন-পালন জাহান্নামের আগুনের প্রতিবন্ধক হবে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমার নিকট দু’কন্যাসহ একজন মহিলা ভিক্ষার জন্য আসল। সে সময় আমার নিকট কিছুই ছিল না, শুধু একটি খেজুর ছিল। খেজুরটি আমি তার হাতে দিলাম। সে খেজুরটি দু’ভাগে ভাগ করে দু’কন্যাকে দিল এবং নিজে তা চেখেও দেখল না। অতঃপর উঠে দাঁড়াল এবং চলে গেল। এরপর নবী করিম (সা.) যখন ঘরে এলেন তখন আমি তাকে এ ঘটনা শুনালাম। তিনি বললেন, যে ব্যক্তিকেই এ কন্যার মাধ্যমে পরীক্ষায় নিক্ষেপ করা হয়েছে এরপর সে তাদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করেছে। তাহলে এ কন্যারাই তার জন্য জাহান্নামের আগুনের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।’ [বুখারি ও মুসলিম]
রাসূলুল্লাহ (সা.) কন্যা প্রতিপালনের জন্য বেহেশতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির তিনটি মেয়ে এবং সে তিনটি মেয়েকেই নিজের অভিভাবকত্বে রেখেছে। তাদের প্রতি রহম করেছে। তাহলে তার জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে। কোন গোত্রের এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল যদি দু’কন্যা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) জবাব দিলেন যদি দু’কন্যা হয় তাহলেও এ সওয়াব পাওয়া যাবে।’ রাবি বলেন যে, মানুষ যদি এক কন্যার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন, তাহলে একের ব্যাপারেও রাসূলুল্লাহ এ সুসংবাদই দিতেন।
হাদিসে এসেছে, ‘নবী করিম (সা.)-এর উপস্থিতিতে এক লোক তার ছেলেকে চুমু দিল; কিন্তু মেয়ের সঙ্গে তেমনটি করল না। রাসূলুল্লাহ (সা.) সঙ্গে সঙ্গে এ ঘটনার প্রতিবাদ করলেন এবং বললেন, তুমি অন্যায়কারী, তোমার উচিত তোমার মেয়েকেও চুম্বন করা এবং তাকে অন্য ঊরুতে বসানো।’
নবী করিম (সা.) শুধু ন্যায়বিচারের কথা মুখে বলতেন না, বাস্তবেও নমুনা উপস্থাপন করতেন।
পারিবারিক জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামের নির্ধারিত বিধানুযায়ী কন্যাসন্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাই আমরা আসুন, কন্যাসন্তানদের সুন্দর আচরণের মাধ্যমে লালন-পালন করে দুনিয়াতে ও আখেরাতে কল্যাণ লাভ করি। আমিন। (সংকলিত)
