নিজস্ব প্রতিনিধি-চোটের কারণে দীর্ঘদিন লাল বলের ক্রিকেটের বাইরে থাকা আনরিখ নরকিয়া আবারও টেস্টে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আসন্ন তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাথমিক দলে জায়গা পেয়েছেন ৩২ বছর বয়সী এই পেসার। চূড়ান্ত দলেও থাকার প্রত্যাশা করছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের পর বাংলাদেশের বিপক্ষেও টেস্ট সিরিজ খেলবে দক্ষিণ আফ্রিকা। দুই সিরিজকে সামনে রেখে নরকিয়া এখন নিজেকে প্রস্তুত করছেন মূলত লাল বলের ক্রিকেটের জন্য।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের মার্চের শুরুতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট খেলেছিলেন নরকিয়া। এরপর তিন বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাকে আর দেখা যায়নি। একই বছরের সেপ্টেম্বরের পর ওয়ানডে বা লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও খেলেননি তিনি। চোটের কারণে গত কয়েক বছরে তার ক্রিকেট মূলত টি-টোয়েন্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপে দুর্দান্ত বোলিং করেছিলেন নরকিয়া। এরপর আবারও চোটে ছিটকে যান। সেই বিশ^কাপ থেকে পরের বিশ^কাপের মধ্যবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে টি-টোয়েন্টি খেলেছেন মাত্র তিনটি। ভারতের বিশ^কাপেও দুটি ম্যাচে ভালো বোলিং করেছিলেন। কিন্তু সেখানেও চোট তার ফেরার পথ থামিয়ে দেয়।
এবার দীর্ঘ লড়াই শেষে আবারও টেস্টে ফেরার কাছাকাছি নরকিয়া। তিনি জানিয়েছেন, বেশ কিছুদিন ধরেই তার প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য লাল বলের ক্রিকেট।
“বেশ কিছুদিন আগে থেকেই আমার প্রস্তুতি চলছে মূলত লাল বলকে ঘিরেই। লাল বলে স্কিল মেলে ধরা, ধীরে ধীরে এবং সঠিক উপায়ে খেলার পরিমাণ বাড়ানো এবং ওভারের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করাটাই ছিল আমার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু।”
নিজের দক্ষতা ও বোলিংয়ের বিভিন্ন দিকেও নতুন করে কাজ করছেন তিনি। জাতীয় দলের বোলিং কোচ পিট বোথার সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করছেন নরকিয়া। দুজনই গেবেখায় থাকায় কাছাকাছি থেকে কাজ করার সুযোগও পাচ্ছেন।
“আমার বোলিং অ্যাকশন এবং স্কিলের দিক থেকে কোথায় উন্নতি করতে পারি, তা আমাকে দেখতে হয়েছে এবং কোচ পিটের সঙ্গে এ নিয়ে বেশ ভালোই আলোচনা হয়েছে। আমি নিজেও অ্যালাইনমেন্টের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি এবং বোলিং অ্যাকশনকে আরও ভালো, শক্তিশালী, টেকসই ও নির্ভরযোগ্য করার চেষ্টা করছি।”
চোটের ইতিহাস নরকিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পিঠে স্ট্রেস ফ্র্যাকচারসহ নানা ধরনের গুরুতর চোটে বারবার মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাকে। তার বোলিং অ্যাকশন ‘চেস্ট-অন’ ও ‘রিপিটেবল’ হলেও অতিরিক্ত গতির ওপর নির্ভরতা চোটের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সেরা সময়ে নিয়মিত ১৪৫ থেকে ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করেছেন নরকিয়া। কখনো কখনো তার গতি ১৫৫ থেকে ১৫৬ কিলোমিটারও ছাড়িয়েছে।
টি-টোয়েন্টিতে কয়েক বছর কাটানোর পর টেস্টে ফেরার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে বোলিং করাই হবে তার অন্যতম বড় পরীক্ষা। সেই প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তিনি। তবে টেস্ট ক্রিকেটে ফেরার আকাক্সক্ষাই তাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করছে।
“টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে কঠিন সময়ের ব্যাপারটি ভাবনায় থাকে না। সেখানে শুধু স্কিল প্রয়োগের কথা মাথায় রাখতে হয়। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে কঠিন সময়, ভালো সময়, কঠোর পরিশ্রমের কথা ভাবতে এবং মনে রাখতে হয় যে, এগুলোই কিছু সেশন পার করতে সাহায্য করে।”
টেস্টে ফেরার সুযোগ পেলে নিজের রোমাঞ্চের কথাও জানিয়েছেন এই পেসার। “আবার যদি টেস্ট ক্যাপ মাথায় তুলতে পারি, খুবই রোমাঞ্চিত হব। বেড়ে ওঠার সময় তো সবসময় এই সংস্করণ খেলারই তাড়না ছিল। এটিই ছিল অনুশীলনের মূল প্রেরণা।”
নরকিয়া যখন টেস্ট ক্রিকেট থেকে দূরে ছিলেন, তখন দক্ষিণ আফ্রিকার দল এই সংস্করণে বড় সাফল্য পেয়েছে। সর্বশেষ আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জিতেছে প্রোটিয়ারা, যা তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষেও উঠেছিল দলটি। বর্তমানে তারা দুই নম্বরে রয়েছে।
এই সফল দলের সঙ্গে এবার নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখতে চান নরকিয়া। প্রধান কোচ শুকরি কনরাডের অধীনে দলের উন্নতিতে মুগ্ধ তিনি।
“গত কয়েক বছরে কোচ শুক্সের কোচিংয়ে দলের যে উন্নতি হয়েছে, তা অসাধারণ। ওরা যেভাবে খেলেছে এবং যেভাবে কাজগুলো করেছে, তা সত্যিই খুব দারুণ। আশা করি, আমি দলকে সাহায্য করতে পারব এবং এক শতাংশ হোক বা দুই শতাংশ, বাড়তি কিছু যোগ করতে পারব।”
তিনি আরও বলেন, দলের অন্য বোলাররা অনেক খেলেছে এবং ভালো করেছে। এখন মাঠে ফিরে দেশের জন্য নিজের অবদান রাখতে চান তিনিও।
টেস্টে নরকিয়ার রেকর্ডও বেশ ভালো। ১৯ টেস্টে তার শিকার ৭০ উইকেট। বোলিং গড় ও স্ট্রাইক রেটও তার সামর্থ্যরে প্রমাণ দেয়। তবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আগের রেকর্ড খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে তিন টেস্টে মোট সাত উইকেট পেয়েছিলেন তিনি।
এবার সেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই টেস্টে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে নরকিয়ার। প্রতিপক্ষের শক্তি তার মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা তৈরি করে বলে জানিয়েছেন তিনি।
“অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে একটু বাড়তি এক্স-ফ্যাক্টর বা আগুন আর প্রাণশক্তি বেরিয়ে আসে। সবাই ভালো করতে চায় এবং প্রত্যেকেই ভালো পারফর্ম করতে চায়। এটা একটা বড় সিরিজ।”
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাথমিক স্কোয়াডে ১৮ জন থাকলেও নিজেদের মধ্যে দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচের পর তা ১৫ জনে নামিয়ে আনার কথা। কাগিসো রাবাদাকে নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। চোটের কারণে লুঙ্গি এনগিডি, কোয়েনা মাফাকা ও ওটনিল বার্টম্যান ছিটকে পড়েছেন। ফলে নরকিয়ার চূড়ান্ত দলে থাকার সম্ভাবনাও জোরালো হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শুরু হবে শুক্রবার। এরপর বাংলাদেশের বিপক্ষেও টেস্ট সিরিজ খেলবে দক্ষিণ আফ্রিকা। দীর্ঘ বিরতির পর নরকিয়া শেষ পর্যন্ত লাল বলের ক্রিকেটে ফিরতে পারেন কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
